জীবন যুদ্ধের এক সংগ্রামী জয়ী নায়কের নাম ডাঃ অজয় মণ্ডল

পার্থ নিয়োগী; সুমনের সেই বিখ্যাত গান ‘হাল ছেড়োনা বন্ধু’ যেন লেখা হয়েছিল তার কথা ভেবেই। আর সেই ব্যাক্তিটি হলেন জনপ্রিয় চিকিৎসক তথা সমাজসেবক ডাক্তার অজয় মন্ডল। দক্ষিন চব্বিশ পরগনার সুন্দরবন সংলগ্ন কুলতলি থানার অর্ন্তগত প্রত্যন্ত গ্রাম জামতলাতে তার জন্ম। তার জন্মের সময় তাদের পারিবারিক অবস্থা ভালই ছিল। কিন্তু তার বাবা ছিলেন সমাজসেবক ও দিলদরিয়া মানুষ । এতটাই তিনি অন্যদের নিয়ে ভাবতেন যে তার পরিবার নিয়ে ভাবার কোন সময়ই ছিলনা। এমনকি তার একমাত্র উপার্জনের ছোট ব্যবসার কথাও ভুলে যেতেন তিনি। ফলে স্বাভাবিক ভাবে তার আর্থিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। একটা সময় তার আর্থিক অবস্থা চরম দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যায়। সে থেকেই দারিদ্রতা তার প্রতিটি সময়ের সঙ্গী। ফলে চরম দারিদ্রতার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকেন অজয় মন্ডল। স্কুলে বই নিয়ে যেতেন হাতে করে। ছিলোনা কোনো ব্যাগ।জুতো ছিঁড়ে গেলে সেলাই করে পরতো। কারন নতুন জুতো কিনতে ১-২ মাস সময় লাগতো । স্কুল জীবনে আর দশটা বন্ধুর মত ব্যাগে করে টিফিন বাক্সে টিফিন নিয়ে যাবার সৌভাগ্য তার কোনদিনই হয়নি। গরীব বলে অনেক সহপাঠি তাকে হেয় ভাবে দেখত। তা গভীর বেদনাবোধের সৃষ্টি করত অজয় বাবুর মনে। মাকে দেখেছেন পরিবারের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে। মাকে দেখেছেন সংসার সামাল দিতে কখনো লাউ কখনো দুধ কখনো পুকুরের মাছ বিক্রি করতে । প্রাইভেট টিউশন আর নতুন বই কেনা তার কাছে ছিল একপ্রকার বিলাসিতা । স্কুলের সিনিয়র ক্লাশের দাদাদের কাছ থেকে পুরনো বই নিয়ে পড়তেন। এভাবেই পড়তে পড়তে স্টার মার্ক্স নিয়ে মাধ্যমিকে খুব ভাল রেজাল্ট হয় তার। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে চরম দারিদ্রতার মধ্যে দিয়ে আধপেটা খেয়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়া। অসাধারন রেজাল্ট করলেন উচ্চমাধ্যমিকেও। সেইসাথে জয়েন্টে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেলে খুব ভাল স্থান করে । ইন্জিনিয়ারিং এ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয় তার। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় বাড়ির আর্থিক অবস্থা। তার পর এক আত্মীয় ডাক্তারের বাড়িতে থেকে আবার শুরু হয় মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি। পরেরবার একদম তাক লাগিয়ে একদম নিজের চেষ্টায় মেডিকেলে ২৭ নং স্থান করে সবাইকে চমকে দেন। কিন্তু এখানেও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ। ডাক্তারি পড়ার অর্থ আসবে কোথা থেকে ? কিন্তু ভাগ্যিস কলকাতা পুলিশ ছিল। অনেকেই অবাক হয়ে ভাববেন এরসাথে কলকাতা পুলিশের সর্ম্পক কি ? আসলে কলকাতা পুলিশের কমিউনিটি বিভাগ বলে একটা শাখা আছে। সংবাদপত্রে অজয় মন্ডলের সাফল্যের কথা পড়ে তারাই যোগাযোগ করে অজয় মন্ডলের সাথে। এরপর কলকাতা পুলিশই অজয় মন্ডলের ডাক্তার অজয় মন্ডল হয়ে ওঠার সমস্ত দায়িত্ব নেয়। তাই আজও কলকাতা পুলিশের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা ঝরে পরে সবসময়। তিনি বলেন ‘ সেদিনের সেই প্রিয় পুলিশ কাকুরা যদি পাশে না থাকতেন তবে আজকের এই চিকিৎসক হয়ে ওঠা তারপক্ষে সম্ভব ছিলনা’। তাই কলকাতায় যখনই তিনি যান তখনই গিয়ে দেখা করেন সেদিনের পুলিশ কাকুদের সাথে।সময়ের চক্রে আজ তিনি ডাক্তার অজয় মন্ডল। এরই মাঝে ২০১৩ তে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসেও সে ভাল ফল করে। কিন্তু IAS হবার স্বপ্ন ছিলো । সেটা না পেয়ে IRS পায় কিন্তু এটা পেয়েও ছেড়ে দেয়। পরের বার চেষ্টা করলে হয়তো IAS পেয়েও যেতো। পরে তিনি দেখলেন আমলাদের হাত বাঁধা রাজনৈতিক নেতাদের কাজে। তাই আর সিভিল সার্ভিসে যোগ না দিয়ে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা না দিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের সরকারি চিকিৎসকের কাজে যুক্ত হন। কিন্তু উনি দেখলেন সরকারী চাকরি করে সমাজের দুঃস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর সময় পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই বাবার অনুমতি নিয়ে সরকারি চিকিৎসকের কাজ থেকে ইস্তাফা দিয়ে তিনি নিজেকে আরও বেশি করে মানুষের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করলেন। দারিদ্রতা কি জিনিস তা তিনি ভোলেননি। কারন অভাব তার নিজে চোখে দেখা তাই শুধু গরীব মানুষের বিনে পয়সায় চিকিৎসা কিংবা স্যামপেল ফাইল দিয়ে সাহায্য নয়। তার চেয়েও অনেক বেশি সামাজিক দায়িত্ব তিনি পালন করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। প্রচুর অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অনেক দুঃস্থ মেধাবী ছাত্র ছাত্রীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন। ২০১৩ থেকে তিনি যে ৯৭ জন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র ছাত্রীর এবং ৫৪ জন মাধ্যমিক ছাত্র ছাত্রীদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় সবাই পেয়েছে ৯০% ওপর নম্বর। তাদের মধ্যে ২ জন চাকরী পেয়ে গেছে। করোনার সময় তিনি যেভাবে মানুষের চিকিৎসা করেছেন কোনরকম ভয়ডর ছাড়া তা সত্যিই দেখার মত। কোচবিহারের রাসচক্রের নির্মাতা আলতাফ মিয়াঁর অসুস্থতার খবর শুনে তিনি নিজে খাদ্যসামগ্রী ওষুধ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তার বাড়িতে। এর পাশাপাশি তিনি আর্থিক সাহায্যও তুলে দেন আলতাফ মিয়াঁর হাতে। কোথাও কারোর ঘর পুড়ে যাওয়া । কোথাও কারোর মেয়ের বিয়ে। কারোর শ্রাদ্ধকার্যে সাহায্য, কোথাও বন্যা , ঝড় । সব জায়গায় তিনি দৌড়ে যান সাহায্যের ডালি নিয়ে। কেউ কখনো তার কাছ থেকে খালি হাতে ফেরেনি । কদিন আগে ময়নাগুড়ি ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট, শুটকাবাড়িতে বিধ্বংসী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আসলে তারা বাবার সমাজসেবার ভাবনাকে তিনি নিজের হৃদয় থেকে গ্রহন করেছেন। তাই নিজের উপার্জনের ৩০% টাকা তিনি সমাজসেবায় খরচ করেন। আর এই কাজে তাকে যে সব সময় অনুপ্রেরনা দিয়ে চলেন তিনি হচ্ছেন তার স্ত্রী প্রখ্যাত সমাজসেবী মধুমিতা মন্ডল। আর স্ত্রী কে নিয়ে এভাবেই সামাজিক কাজে নিজেকে যুক্ত রাখার কাজ চলছে প্রতিদিন প্রতিমুহুর্তে। ওনার স্বপ্ন একটা “দুঃস্থ আশ্রম “ তৈরী করা যেখানে সকল বয়সের দুঃস্থ সব হারানো মানুষগুলোর মাথা জায়গা হবে । তিনি বহু জায়গা থেকে পেয়েছেন বহু পুরস্কার তার মহৎ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ। তারমধ্যে আছে জাতীয়স্তরের ৭ টি পুরস্কার। উনি গরীব দুখী মানুষের কাছে মুশকিল আসান । সত্যিই বর্তমান সময়ের এক বিরল মানুষ ডাক্তার অজয় মন্ডল।